বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে দুই বছর ধরে তাঁতবাজারে চলছে চরম দুর্দিন। তার মাঝেই যমুনা নদীর পানি বেড়ে সিরাজগঞ্জের সদর, বেলকুচি, এনায়েতপুর ও শাহজাদপুর উপজেলার তাঁত পল্লীগুলোতে পানি প্রবেশ করায় তলিয়ে গেছে ছোট-বড় শতাধিক তাঁতশিল্পের কারখানা। বেকার হয়ে পড়েছেন তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অর্ধলাখ শ্রমিক, ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁতমালিকরাও।

এই মুহূর্তে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও তাঁতশিল্পে যে ক্ষতি হয়েছে তা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে আশঙ্কা করছেন এ শিল্পের কারখানা মালিকরা।

এ বিষয়ে জেলার পাওয়ারলুম মালিক সমিতির সভাপতি হাজি বদিউজ্জামান বলেন, ‘চলতি বন্যায় পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে তাঁতকুঞ্জ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের শতাধিক তাঁত কারখানা। পানিতে ডুবে যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে সুতা ও তাঁত মেশিনের যন্ত্রপাতি। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের মতো তাঁতমালিকদের।

এক কথায় আমাদের স্বপ্ন এখন পানিতে নিমজ্জিত। একই সঙ্গে কারখানায় পানি উঠে পড়ায় কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক তাঁত শ্রমিকসহ এই শিল্পসংশ্লিষ্ট অর্ধলাখ মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।’

বন্যা শেষে নতুন করে এই শিল্পটিকে দাঁড় করাতে সরকারি প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে ঋণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তাঁত মালিক সমিতির সভাপাতি হাজি এম এ বাকী বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ জেলার ৫ লক্ষাধিক পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মেশিনে তাঁতপণ্য তৈরি হয়। চলতি বন্যায় জেলার তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুরের হাজার হাজার তাঁত পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। পানি উঠে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বন্যাকবলিত এলাকার বেশির ভাগ কারখানা। পানিতে ডুবে যাওয়ায় তাঁত কারখানার সুতা প্রস্তুত করার ভিম, লোহার ল্যাংগোজ, মেশিনের পায়া ও ইলেকট্রনিক মটরে মরিচা ধরছে, পচন ধরায় নষ্ট হয়ে গেছে সুতাও।

‘বন্যা শেষে তাঁত কারখানা চালু করতে আবারও নতুন করে সুতা কি না ও ভিম তৈরি করতে হবে আমাদের। সংস্কার ও পরিবর্তন করতে হবে পাওয়ারলুম-হ্যান্ডলুমের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁত ব্যবসায়ীরা। পুনরায় কারখানা চালু করতে প্রয়োজনীয় পুঁজির জোগান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁতমালিকরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণ, নকশা তৈরিসহ তাঁত মেশিনে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা তৈরিতে প্রতিদিন কাজ করেন অন্তত ১০ লাখ শ্রমিক। শ্রমিকদের কর্মতৎপরতায় মুখরিত থাকে তাঁতশিল্প এলাকা। কিন্তু চলমান বন্যায় পানি উঠে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে হাজার হাজার তাঁত। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এসব শ্রমিক। ১০ দিন ধরে বেকার থাকা নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

‘আমরাও লোকসানে থাকায় আর্থিক সহযোগিতা করতে পারছি না, মিলছে না সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা। অনেকেই পরিবারের ব্যয় নির্বাহে মাছ ধরা, নৌকা চালানোসহ বিকল্প কাজ করে উপার্জনের চেষ্টা করছেন।’

তাঁত শ্রমিক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘১০ দিন ধরে কাজ নেই, কারখানা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। আমরাও বেকার হয়ে রয়েছি। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। এখনও কোনো ত্রাণ বা সহযোগিতা পাইনি।’

তাঁত শ্রমিক জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁত কারখানায় পানি উঠে পড়েছে, বেকার হয়ে রয়েছি আজ প্রায় ১০ দিন। তাঁতমালিক নিজেও অভাবে আছে, ফলে টাকা চেয়েও পাচ্ছি না। পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে নৌকা চালাচ্ছি।’

বেলকুচি পৌরসভার মেয়র সাজ্জাদুল হক রেজা বলেন, ‘তাঁত শ্রমিকদের মাঝে পৌরসভা থেকে খাদ্য সহায়তা করলেও মালিকদের সহায়তার জন্য তাঁত বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তাঁত বোর্ড তালিকা তৈরি করে আগের মতো সাহায্য করবে বলে জানা গেছে।’

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, ‘তাঁতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে তাঁত বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত আমরা সরকারিভাবে বরাদ্দ করা ত্রাণের চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করছি শ্রমিকদের মাঝে।’

সিরাজগঞ্জ তাঁত বোর্ডের লিয়াজোঁ অফিসার আল মামুন বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁতের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য তালিকা তৈরি করছি, তালিকা তৈরি হলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্ত তাঁত শ্রমিক ও মালিকদের জন্য অনুদান এলে তা বণ্টন করা হবে।’

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ সূর্য জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও মালিকদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ও তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে বন্যাকবলিত তাঁত কারখানার তালিকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যা শেষে পুনরায় কারখানা চালু করতে স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার জন্য মালিকদের পাশে থাকবে চেম্বার অব কমার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published.