সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কেন এত আইন ?

ডেস্ক রিপোর্ট
আওরঙ্গজেব কামাল :
বর্তমান সময়ের সাংবাদিকরা একটা কঠিন সময় পার করছে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা বলতে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ছিলেন। কিন্ত এখন সেই রয়েসে সেই সব মর্যাদার বাহিরে। মূলত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, মুক্তচিন্তা ও পেশাগত অধিকার, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সার্বজনীন তথ্য পাওয়ার অধিকার, গণতন্ত্রকে রক্ষা ও নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তা সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকায় প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু নানামুখী চাপে ইহা আজ জর্জরিত। তবে সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অপরিহার্য নিয়ামক গণমাধ্যমের অবাধ ও মুক্তচিন্তার ভূমিকা পালনে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ও দাবি ছিল গণতন্ত্র। সংবিধানেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সুসংহত করা হয়েছিল। যদিও দেশে মত প্রকাশ ও সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করতে নানা আইন-আদালত সৃষ্টি করা হচ্ছে। সুরক্ষার কথা বলা হলেও উল্টো এসব আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে সাংবাদিকদের হয়রানি ও হেনস্তায়। বিশেষ করে গত চার বছরে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রয়োগের মূল লক্ষ্যবস্তুই ছিল সাংবাদিকরা। গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমকে কেন্দ্র করে প্রণয়ন হচ্ছে আরো কয়েকটি আইন। স্বাধীন মত প্রকাশ ও সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এত আইন কেন ? এছাড়া বর্তমানে আমার নতুন আইন করার চিন্তা ভাবনা সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরন নয়কি? পুুরনো আইনে তো সাংবাদিকরা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন না। পুরনো আইনের মধ্যে রয়েছে ডিফেমেশন, অফিশিয়াল সিক্রেসি, কনটেম্পট অব কোর্ট আইন। নতুন আইন আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি, গণমাধ্যমকর্মী আইন, ডাটা প্রটেক্ট ল, ওটিটি। এসব আইনের নাম ভিন্ন হলেও এগুলো প্রয়োগের যে পরিধি, সেখানে ঘুরেফিরে মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এগুলো সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিবন্ধক। প্রশ্ন হলো, স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে এত আইন কেন? আমরা কী করি? যার জন্য এত আইন দিয়ে আমাদের হাত-পা বেঁধে দিতে হবে। এখন আবার গণমাধ্যম আদালত, আপিল আদালত এমন নানা আদালত সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের হাত-পা আরো বেশি বেঁধে দেয়ার প্রয়াস হচ্ছে। গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ হবে না। গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটি চেতনা, একটি স্বপ্ন ও একটি দাবি। তাই আমি মনে করি, গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে গণতন্ত্রকে ব্যাহত করার চেষ্টা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। শুধু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২০ জায়গায় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যার ১৪টিই জামিন অযোগ্য। একজন সাংবাদিক হিসেবে কী অপরাধে অপরাধী যে আপনাকে জামিনও দেয়া যাবে না। গত চার বছর সুস্পষ্টভাবে এ আইনের প্রয়োগ দেখা গিয়েছে। এর প্রয়োগ হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে, রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে। বর্তমানে সাংবাদিকদের মাথার ওপর আরেকটি খড়্গ ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে নতুন আইন করা হচ্ছে, নাকি প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের নামে এমন সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের নতুন উপায়ে পরিণত হবে? এ প্রশ্ন উঠছে । দেশে প্রচালিত
যেসব আইন আছে এবং আইনের বাইরেও যা ঘটছে, তাতে সরকার সন্তুষ্ট নয়; আরও নতুন আইন চাই বলেই মনে হচ্ছে। নতুন আইন হোক কিংবা প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধন করেই হোকনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কেবল সেটাই হবে, তা নয়। ইতিমধ্যে উপাত্ত সুরক্ষা আইন, বিটিআরসির প্রবিধান এবং ওটিটি নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এগুলোর লক্ষ্য একটাই—নাগরিকের কথা বলার জায়গা একবারে বন্ধ করে দেওয়া। দেশের প্রচালিত আইনে এক বছরে ৩৮ জন সাংবাদিক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা, গ্রেফতার, রিমান্ড ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলায় ৩৮ জন ছাড়াও মানহানিসহ অন্যান্য মামলায় হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন ৫৮ জন সংবাদিক ও সংবাদকর্মী। এ বছর হামলার শিকার হয়েছেন ৯০ জন সাংবাদিক। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে অন্তত ১১৮ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। ৬২টি ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা হয়েছে। গত ৩ মাসে ৩ জন গণমাধ্যমকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ঘটেছে। সাংবাদিদের সুরক্ষার বিষয়ে কারো কোন খেয়াল নেই বললে চলে। সাংবাদিকরা পায়না ঠিকমত বেতন ভাতা। বর্তমানে রাজনৈতিক কারনে সাংবাদিকরা রয়েছে এক প্রকার নোনঠাসা। সংবাদ সংগ্রহের আগে হয় হামলা বা মামলার স্বিকার। এ সব বিষয়ে কেহ কোন কথা বলেন না। শুধু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নতুন নতুন আইন করে সাংবাদিকদের হাতপা বেধে দিতে ব্যস্থ রয়েছে অনেকে। এ সব আইনের কতটুকু যুক্তিযুক্ত রয়েছে বিষয়টি ভালো ভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি ; ঢাকা প্রেস ক্লাব
মহাসচিব : বাংলাদেশ ন্যাশনাল নিউজ ক্লাব

Leave a Reply

Your email address will not be published.